সহজ উপায়ে আধুনিক ধান চাষ পদ্ধতি
আধুনিক ধান চাষ পদ্ধতি অবলম্বন করে ধান চাষ করলে অধিক ফলন পাওয়া যায়। আমাদের দেশের প্রধান খাদ্যশস্য হলো ধান। এই জন্য ধান নিয়ে আমাদের দেশে বেশি আলোচনা করা হয়। কিভাবে ধান চাষ করলে অধিক ফলন পাওয়া যাবে? এই নিয়ে চাষীরা ভাবতে থাকে। বাংলাদেশ পৃথিবীর ৪তর্থ তম ধান উৎপাদনকারী দেশ। বাংলাদেশে প্রতি হেক্টর জমিতে প্রায় ৪.২ টন ধানের ফলন হয়ে থাকে। এক এক এলাকাতে এক একটি জাতের ধান ভালো ফলে। অধিক ধানের ফলনের জন্য আমাদের আধুনিক ধান চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।
আধুনিক ধান চাষ পদ্ধতি
ভালো ফলন পেতে হলে আধুনিক ধান চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে একজন চাষীর জানা প্রয়োজন। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা আধুনিক ধান চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো। যে সকল বিষয় গুলো ধান চাষে খেয়াল রাখা উচিত সেগুলো নিম্নে পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হয়েছে।
আরো পড়ুনঃ সহজ ও আধুনিক পদ্ধতিতে আলু চাষ
ধানের বীজ বাছাই পদ্ধতি
আধুনিক ধান চাষ পদ্ধতির এই পর্যায়ে যে সকল বিষয় গুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে সেগুলো হলোঃ
- ধানের বীজ বাছাইয়ের জন্য করনীয় কি কি?
- ধানের বীজ শোধন ও জাগ দেয়ার পদ্ধতি কি?
- ধানের আদর্শ বীজতলা তৈরীর পদ্ধতি কি কি?
- ধানের বীজতলায় বীজ বপনের পদ্বতি কি?
- অতিরিক্ত ঠান্ডায় ধানের বীজতলায় কি যত্ন নিতে হবে?
- ধানের বীজতলায় পরিচর্যা পদ্ধতি কি কি?
- ধানের চারা উঠানো বা বহন করার সঠিক পদ্ধতি কি কি?
- ধানের জমি তৈরীর পদ্বতি কি?
- ধানের চারা রোপনের পদ্বতি ও চারার বয়স কত হলে ভাল হয়?
ধানের বীজ বাছাইয়ের জন্য করনীয় কি কি?
ধানের ভালো ফলন পেতে হলে ধানের বীজ সঠিক পদ্ধতিতে বাছাই করতে হবে। নিম্নে কয়েকটি ধাপে বীজ বাছাই পদ্ধতি দেওয়া হলে-
- প্রথমে একটি পাত্রে ৫ লিটার পানি নিতে হবে।
- এবার ১৮৮ গ্রাম ইউরিয়া সার পানিতে মিক্স করতে হবে।
- এবার ৫ কেজি ধানের বীজ ইউরিয়া মিক্স পানিতে দিয়ে নাড়তে হবে।
- এবার খেয়াল করবেন পুষ্ট ধানের বীজ গুলো পানির নিচে চলে যাবে এবং অপুষ্ট ধানের বীজ গুলো পানির উপরে ভাসবে।
- এখন অপুষ্ট ধানের বীজ গুলো তুলে ফেলে দিতে হবে।
- এখন পুষ্ট ধানের বীজ গুলো পরিষ্কার পানিতে ৩-৪ বার ধুয়ে নিতে হবে।
- এখন ইউরিয়া মেশানো পানি গুলো বীজতালাই সার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
ধানের বীজ শোধন ও জাগ দেওয়ার পদ্ধতি কি?
বাছাই করা ধানের বীজ হলে, ধান শোধন করার প্রয়োজন হয় না। ধানের বীজ শোধন ও জাগ দেওয়ার পদ্ধতি গুলো নিম্নে কয়েকটি ধাপে দেওয়া হলো-
- ধানের বীজ শোধনের জন্য ৫২ থেকে ৫৫ °C তাপমাত্রায় গরম পানিতে ১৫ মিনিট রাখলে জীবাণুমুক্ত হয়।
- ধানের বীজ গুলো যদি দাগমুক্ত থাকে তাহলে, ছত্রাকনাশক দিয়ে বীজ গুলো শোধন করে নিতে হবে।
- এবার ধানের বীজ গুলো বীজ ব্যাগে লোড করে নিতে হবে।
- এখন খর বিছিয়ে দিয়ে বীজ ব্যাগটি রেখে আবার উপরে খর বিছিয়ে দিতে হবে।
- এবার ভারী কিছু দিয়ে চাপা দিয়ে রাখতে হবে।
- আউশ ও আমন মৌসুমের বীজ গুলো ৪৮ ঘন্টা জাগ দিতে হবে এবং বোরো মৌসুমে ৭২ ঘন্টার জাগ দিতে হবে।
- এই সময়ের মধ্যে বীজ গুলো ভালো ভাবে অঙ্কুর বের হবে।
- এখন ধানের বীজ গুলো বীজতলাতে বপন করা যাবে।
ধানের আদর্শ বীজতলা তৈরীর পদ্ধতি কি কি?
ভালো ধানের চারা পেতে হলে আদর্শ বীজতলা তৈরী করতে হবে। একটি অদর্শ ধানের বীজতালা তৈরি করতে যে সকল পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয় তা নিম্নে দেওয়া হলো-
- আদর্শ ধানের বীজতলা তৈরির জন্য দো-আশ ও এটেল মাটি নির্বাচন করা উত্তম।
- জমিতে পরিমান মতো জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে।
- এবার জমিতে পানি দিয়ে ৩-৪ টি চাষ দিয়ে মই দিতে হবে।
- এবার ৫-৭ দিন জমি ফেলে রাখতে হবে।
- এখন আগাছা গুলো পচে গেলে আবার চাষ দিয়ে মই টেনে কাদা করতে হবে।
- এখন ১ মিটার চওড়া করে জমির বেড তৈরি করতে হবে।
- প্রতি বেড এর মাঝে ২০-৩০ সে.মি. জাইগা ফাকা রাখতে হবে।
ধানের বীজতলায় বীজ বপনের পদ্বতি কি?
সঠিক পদ্ধতিতে বীজতলায় বীজ বপন করতে হবে। ভালো ভাবে বীজ বপন করতে না পারলে ভালো চারা পাওয়া যাবে না। নিম্নে কয়েকটি ধাপে ধানের বীজতলায় বীজ বপন পদ্ধতি দেওয়া হলো-
- প্রতি এক বর্গমিটার বীজতলায় ৮০ - ১০০ গ্রাম ধানের বীজ বপন করা উত্তম।
- ধানের বীজ বপনের পর ৪-৫ দিন পাখি তাড়ানোর ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।
- বীজতলায় নালা ভর্তি করে পানি রাখতে হবে।
অতিরিক্ত ঠান্ডায় ধানের বীজতলায় কি যত্ন নিতে হবে?
- অতিরিক্ত ঠান্ডায় ধানের বীজতলায় যত্ন না নিলে চারা গুলো অপুষ্ট হবে। ধানের চারা গুলো রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে। তাই অতিরিক্ত ঠান্ডায় ধানের বীজতলায় যত্ন নিতে হবে। নিম্নে কয়েকটি ধাপে ধানের বীজতলায় অতিরিক্ত ঠান্ডায় যত্ন নেওয়া পদ্ধতি গুলো দেওয়া হলো-
- সকাল ১০ টা থেকে সন্ধা পর্যন্ত বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।
- সকালে বীজতলায় পানি গুলো বের করে দিয়ে নতুন পানি দিতে হবে।
- সকালে ধানের চারার উপর থেকে শিশির গুলো ঝরিয়ে দিতে হবে।
ধানের বীজতলায় পরিচর্যা পদ্ধতি কি কি?
- ধানের বীজতলায় সব সময় নালা ভর্তী পানি রাখতে হবে।
- চারা গজানোর ২-৩ দিন বেডের উপর পর্যন্ত পানি রাখতে হবে।
ধানের চারা উঠানো বা বহন করার সঠিক পদ্ধতি কি কি?
- প্রথমে বীজতলায় পানি দিয়ে মাটি নরম করে নিতে হবে।
- এমন ভাবে বহন করতে হবে যেনো চারা গুলো আঘাত না পাই।
ধানের জমি তৈরীর পদ্বতি কি?
- সাধারণত ২-৫ বার জমি চাষ দিতে হবে।
- জমিতে থকথকে কাদা তৈরি করতে হবে।
- জমি উঁচুঁনিচু থাকলে সমান করতে হবে।
ধানের চারা রোপনের পদ্বতি ও চারার বয়স কত হলে ভাল হয়?
- আউশ ধানের চারা ২০-২৫ দিন বয়সে চারা রোপন করা উত্তম।
- রোপা আমন ধানের চারা ২৫-৩০ দিন বয়সে চারা রোপন করা উত্তম।
- বোরো ধানে ৩৫-৪০ দিন বসয়ে চারা রোপন করা উত্তম।
- প্রতি হেক্টর জমিতে ৮-১০ কেজি ধানের বীজের চারা প্রয়োজন হয়।
সঠিক পদ্ধতিতে ধান চাষে সার ব্যবস্থাপনা
ধানে কি কি সার দিতে হয়? ধানের জন্য সুপারিশকৃত সার কি? ইত্যাদি আরো কিছু বিষয় সম্পর্কে আমাদের অন্য একটি আর্টিকেলে আলোচনা করা হয়েছে।
সঠিক পদ্ধতিতে ধান চাষে আগাছা ব্যবস্থাপনা
ধানের আগাছা পরিচিতি, ধানের আগাছা নাশক ঔষধের নাম ইত্যাদি আরো কিছু বিষয় সম্পর্কে আমাদের অন্য একটি আর্টিকেলে আলোচনা করা হয়েছে।
সঠিক পদ্ধতিতে ধান চাষে সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা
সঠিক ভাবে ধানে সেচ দেওয়ার পদ্ধতি সহ আরো কিছু বিষয় সম্পর্কে আমাদের অন্য একটি আর্টিকেলে আলোচনা করা হয়েছে।
সঠিক পদ্ধতিতে ধান চাষে অনিষ্টকারী পোকা ও মেরুদন্ডী প্রানী ব্যবস্থাপনা
কোনটি ধানের ক্ষতিকারক পোকা? ধানে কি কি পোকা আক্রমণ করে? ধানের মাজরা পোকা দেখতে কেমন? ধানের পানির পোকা কি? ইত্যাদি আরো কিছু বিষয় সম্পর্কে আমাদের অন্য একটি আর্টিকেলে আলোচনা করা হয়েছে।
সঠিক পদ্ধতিতে ধানের রোগ ব্যবস্থাপনা
ধানের প্রধান রোগ কোনটি? ধানে কি রোগ হয়? ব্লাস্ট রোগের লক্ষণ কি? ইত্যাদি আরো কিছু বিষয় সম্পর্কে আমাদের অন্য একটি আর্টিকেলে আলোচনা করা হয়েছে।
সহজ পদ্ধতিতে ধান কাটা, মাড়াই ও সংরক্ষণ
ধানের শিষের শতকরা ৮০ ভাগ ধান শক্ত হলে, ধান কাটার উপযুক্ত সময়। ধান বেশি পেকে গেলে ধান কাটে যেয়ে অনেক ধান ঝরে যায়। ধান কাটার পর যত দূরত্ব সম্ভব ধান বাসাই নিয়ে চলে আসতে হবে। ধান মাঠে মাড়াই করতে হবে, এতে ধান ঝরবে কম। ধান ৩-৪ দিন রোদে শুকালে সংরক্ষণ করে রাখা যাবে।
FAQ
বাংলাদেশ পৃথিবীর কত তম ধান উৎপাদনকারী দেশ?
বাংলাদেশ পৃথিবীর ৪তর্থ তম ধান উৎপাদনকারী দেশ।
বাংলাদেশে প্রতি হেক্টর জমিতে কত পরিমানে ফলন হয়?
বাংলাদেশে প্রতি হেক্টর জমিতে প্রায় ৪.২ টন ধানের ফলন হয়ে থাকে।
